গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ ও নব্য বৈষম্যের বিষবাষ্প
মার্চ ০৮ ২০২৬, ২১:০৯
আগের শৃঙখল বর্তমানের খড়গ: বৈষম্যের চক্রাবর্ত
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তরুণদের কণ্ঠস্বর যখন ষড়যন্ত্রের মুখে
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন ৫ই আগস্ট। যে বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙতে এদেশের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, সেই আন্দোলনের মূল সুরই ছিল- একটি ইনসাফভিত্তিক, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ৫ই আগস্ট-পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম জগতে এক নতুন ও ভয়ংকর বৈষম্যের ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে।
বিগত সরকারের আমলে যেসব সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মীদের ‘জামায়াত-শিবির’ কিংবা ‘তারেক রহমান কানেকশন’ তকমা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, আজ এই নতুন বাংলাদেশে তাদেরই আবার ‘আওয়ামী লীগের লেবাস’ লাগিয়ে কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল মৌখিক অপবাদে একটি সংবাদপত্র হাউজের সরকারি বিজ্ঞাপন ও ডিএফপি পত্র (ক্রোড়পত্র) বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে হাজার হাজার সংবাদকর্মী ও তাদের পরিবার আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
এই পরিস্থিতিতে বর্তমান গণমুখী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর কাছে সাংবাদিক সমাজ ও সংবাদপত্র মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে এক জোরালো আহ্বান ও প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।
আগের শৃঙ্খল বনাম বর্তমানের খড়গ: বৈষম্যের চক্রাবর্ত
৫ই আগস্টের আগে এদেশের এক শ্রেণির সংবাদপত্র হাউজ গোয়েন্দা সংস্থা ও তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়েছিল। সে সময় অনেক প্রগতিশীল এবং সাহসী সংবাদকর্মীকে তকমা দেওয়া হয়েছিল যে তারা জামায়াত-বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। সেই দোহাই দিয়ে তাদের সচিবালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, বাতিল করা হয়েছিল অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা সেই সময় বৈষম্যের শিকার হয়েছিল, আজ ৫ই আগস্টের পর তারাই আবার ভিন্ন নামে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এখন সেই হাউজগুলোকেই ‘আওয়ামী লীগ সমর্থক’ তকমা দিয়ে বন্ধ করার পায়তারা চলছে। প্রশ্ন জাগে, এই কি তবে সেই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ যার জন্য তরুণ সমাজ প্রাণ দিয়েছিল?
যাচাই-বাছাইহীন তকমা: প্রশ্নবিদ্ধ যখন প্রশাসন
একটি পত্রিকা হাউজের মালিকপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগের কি না, তা যাচাই করার জন্য কিছু নূন্যতম মানদণ্ড থাকা উচিত। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছে বিনীত প্রশ্ন:
উক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক কি বিগত সরকারের কোনো মন্ত্রী, এমপি বা উপদেষ্টা ছিলেন?
তিনি কি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বা জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ের কোনো পদে আসীন ছিলেন?
সেই পত্রিকার কোনো পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক কি সরাসরি দলীয় রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন?
যদি এই প্রশ্নের উত্তরগুলো ‘না’ হয়, তবে কোন যুক্তিতে কেবল অনুমানের ভিত্তিতে বা বিশেষ কোনো মহলের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সেই পত্রিকার সরকারি বিজ্ঞাপন ও অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বন্ধ রাখা হচ্ছে? একটি সংবাদপত্র হাজার হাজার সংবাদকর্মী ও শ্রমিকের রুটিরুজির জায়গা। কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রমাণ ছাড়াই একটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া কি রাষ্ট্রীয় অবিচার নয়?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তরুণদের কণ্ঠস্বর যখন ষড়যন্ত্রের মুখে
যেসব সংবাদপত্র সবসময় এদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা এবং ৫ই আগস্টের তরুণ সমাজ ও ছাত্র যোদ্ধাদের বিপ্লব নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে আসছে, আজ তাদের বিরুদ্ধেই চলছে গভীর ষড়যন্ত্র। অভিযোগ উঠেছে, একটি কুচক্রী মহল সুকৌশলে সরকারের কান ভারি করছে যাতে সুস্থ ধারার গণমাধ্যমগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
এদেশের সংবাদকর্মীরা কেবল কোনো দলের কর্মী নন, তারা দেশের জনগণের কণ্ঠস্বর। একটি সংবাদপত্র হাউজ যখন সারাবছর সরকারের কোষাগারে লক্ষ লক্ষ টাকার ভ্যাট ও ট্যাক্স জমা দেয়, তখন তারা রাষ্ট্রের কাছে নূন্যতম সম্মান ও সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু বর্তমানে পর্যাপ্ত সার্কুলেশন থাকা সত্ত্বেও এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কাজগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও, রহস্যজনক কারণে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি বা অ্যাক্রিডিটেনশন কার্ড দেওয়া হচ্ছে না।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নিকট সুনির্দিষ্ট দাবি ও সুপারিশ
গণমাধ্যমবান্ধব এই সরকারের মাননীয় মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর কাছে সংবাদকর্মী ও সংবাদপত্র মালিকদের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত দাবিগুলো পেশ করা হলো:
নিরপেক্ষ গোয়েন্দা তদন্ত: কোনো পত্রিকা হাউজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য যাচাই করুন। দেখুন সেই পত্রিকার মালিক বা সংবাদকর্মীরা বিগত সরকারের আমলে বিএনপি বা জামায়াতের কতটুকু ক্ষতি করেছে বা সরাসরি কোনো দমন-পীড়নে অংশ নিয়েছে কি না। কেবল মুখের কথায় কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা বন্ধ হোক।
প্রতিষ্ঠানের দায় বনাম ব্যক্তির দায়: যদি কোনো সংবাদপত্রের মালিক ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ করে থাকেন, তবে প্রচলিত আইনে তার বিচার হোক। কিন্তু তার জন্য পুরো প্রতিষ্ঠান বা সেখানে কর্মরত হাজার হাজার নিরপরাধ সংবাদকর্মীকে কেন ভোগান্তিতে পড়তে হবে? প্রতিষ্ঠানটি এদেশের জনগণের, কোনো বিশেষ দলের নয়।
অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ও সচিবালয় প্রবেশ: যেসব সংবাদপত্রের পর্যাপ্ত প্রচার সংখ্যা (সার্কুলেশন) রয়েছে এবং যারা নিয়মিত ট্যাক্স-ভ্যাট প্রদান করে, তাদের সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে অতি দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ও সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হোক।
বৈষম্য দূরীকরণ: যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ যুদ্ধ করেছে, সেই একই বৈষম্য যেন নতুন কোনো মোড়কে ফিরে না আসে। আওয়ামী লীগের তকমা দিয়ে কোনো নিরপরাধ প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত রাখা মানেই হলো ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে অপমান করা।
সংবাদকর্মীদের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন
একটি সংবাদপত্র বন্ধ হওয়া মানে কেবল একটি কাগজ বন্ধ হওয়া নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে হকার, মুদ্রণ শ্রমিক, বিপণন কর্মী এবং হাজার হাজার সংবাদকর্মীর পরিবার। বিগত আমলে যারা ‘জামায়াত পুত্র’ বলে গালি খেয়েছিল, আজ তাদেরই আবার ‘আওয়ামী লীগ পুত্র’ বলে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। এই লেবাস লাগানোর খেলা বন্ধ করতে হবে। সংবাদপত্রের কোনো দল নেই, সংবাদপত্রের পরিচয় তার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যদি অবিলম্বে এই বৈষম্য দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে হাজার হাজার পরিবার পথে বসতে বাধ্য হবে। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার, এই সরকার কোনো নির্দিষ্ট মহলের তুষ্টির জন্য সাধারণ সংবাদকর্মীদের পেটে লাথি মারবে না।
আমরা আশা করি, মাননীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি বিবেচনা করবেন। এদেশের সংবাদকর্মীরা চান একটি স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে। বৈষম্যের শিকার হওয়া কোনো হাউজের সংবাদকর্মীরা যেন আর কোনো প্রকার ষড়যন্ত্রের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে এনে সংবাদপত্রের ওপর থেকে এই অদৃশ্য অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ রইল।
