প্রার্থীদের লাগামহীন অর্থ ব্যয় !

ফেব্রুয়ারি ০৯ ২০২৬, ০২:২৩

আমার বরিশাল ডেস্ক,

নিজস্ব প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের লাগামহীন অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ জানিয়েছে ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রচারণার সময় শেষ হওয়ার অনেক আগেই প্রার্থীরা নির্ধারিত সীমার এ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে বলেও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে, গত ৪ ডিসেম্বর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সার্বিকভাবে ৩৩.৮ শতাংশ প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছে এবং তারা গড়ে ১ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ৩১০ টাকা ব্যয় করার কথা জানায়।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘গণভোট ও প্রাক্‌-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে গণভোট ও প্রাক্‌-নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক। পরে সার্বিক পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

টিআইবি তার পর্যবেক্ষণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রচারণার জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত অর্থ ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করেছে। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত শীর্ষ দুই নির্বাচনি জোটের দলগুলো দলীয়ভাবে ফেসবুক প্রচারণায় সর্বোচ্চ ব্যয়ের কথা জানিয়েছে।

প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত আয়-ব্যয়, দ্বৈত নাগরিত্ব সম্পদ, বিদেশে আয় ও সম্পদ, ঋণের খবর প্রচার হলেও তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন তা এ নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা টিআইবি এ নিয়ে প্রশ্ন রেখেছে। একইসঙ্গে এবারের নির্বাচনে অন্তত ৪৫ জন ঋণগ্রস্ত প্রার্থী রয়েছেন বলে টিআইবি জানায়। ঋণগ্রস্তদের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি উদ্বেগ প্রকাশ করে।

দেশে চলমান যৌথ বাহিনীর অভিযান চললেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলেও টিআইবির পর্যবেক্ষণে ওঠে এসেছে। তারা জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে শুরুর দিকে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও বিভিন্ন দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, কোন্দল, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

এসময় তিনি নির্বাচন সুচারুভাবে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিসম্মত আচরণের কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘তারা চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।’

এবারের নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলা হলেও কোনো দলই সেটি করেনি বলে জানায় টিআইবি। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘একজন নারীকেও মনোনয়ন না দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জামায়াত দেবে বলে আমরা আশাও করিনি। কিন্তু যাদের কাছ থেকে আশা করেছিলাম, তারা কী করেছে? ক্রিয়াশীল সবচেয়ে বড় দলের প্রার্থীদের ২ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। নারী প্রার্থী মনোনয়নে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অর্থ, ধর্ম, পেশি, পুরুষতন্ত্র ও গরিষ্ঠতন্ত্র—এই পাঁচটি বিষয়কে বাংলাদেশে ‘মৌলিক রাজনৈতিক পুঁজি’ বলে উল্লেখ করেছেন ইফতেখারুজ্জামান।

সংবাদ সম্মেলনে শুরুর বক্তব্যে গত শনিবার রাতে বাংলাদেশ টাইমস নামের একটি গণমাধ্যমের কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের তুলে নেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের কার্যালয় থেকে তুলে নেওয়া অগ্রহণযোগ্য। যে যুক্তিতেই এটা করা হোক, কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া এভাবে সাংবাদিকদের তুলে নেওয়া মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য মধ্যযুগীয় সহিংসতার দৃষ্টান্ত। কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জন্য যথাযথ পদ্ধতি আছে। পরে ওই সাংবাদিকদের ফেরত পাঠানো হলেও এর মাধ্যমে পুরো গণমাধ্যমের ওপর ভীতিমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টির কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।’

টিআইবির প্রাক্-নির্বাচনী সার্বিক পর্যবেক্ষণে সাতটি বিষয় তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে গণভোট নিয়ে ১১টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বলা হয়েছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের দোদুল্যমানতা ও উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিপ্রত্যাশী অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা শুরুতেই গণভোটের বিষয় ও প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট এবং সংসদে উচ্চকক্ষবিষয়ক বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত যদি ওই সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় বিবেচনা করা হয়েও থাকে, তবু বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে।

টিআইবি জানায়, অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ধরনের গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয়ের সুযোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
একইসঙ্গে সরকারের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচার সম্পর্কে যে নির্দেশনা (হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচারকে আইনসম্মত নয় বলা) নির্বাচন কমিশন দিয়েছিল, তা কতটুকু সুচিন্তিত, আইনসম্মত ও গঠনমূলক, এসব প্রশ্নের কারণে আরও অধিকতর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। সংস্থার উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের, জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক ও গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন....