২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাতে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা শেষে বগুড়া থেকে কর্মস্থল ময়মনসিংহ ফেরার পথে চলন্ত বাসে চালক, চালকের তিন সহকারী তাকে ধর্ষণ করেন। পরে তারা তাকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকার রাস্তার পাশে ফেলে যান। সে সময় দেশ জুড়ে তুমুল আলোচিত হয় ঘটনাটি।
গণপরিবহনে নারীদের নীরবযুদ্ধ
ডিসেম্বর ০৯ ২০২৫, ০০:৪৬
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন অসংখ্য নারী যাতায়াত করেন। কেউ কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার জন্য, চিকিৎসার জন্য কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হন।
রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিন ঘটছে অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা যেখানে কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়াচ্ছেন। দুর্ঘটনার পাশাপাশি গণপরিবহনে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু গণপরিবহনে নারীর নিপীড়নের মতো গুরুতর বিষয়টি অনেক সময়ই উপেক্ষিত থাকে। ঢাকা শহর প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও নগর পরিকল্পনায় দ্রুত বদলে যাচ্ছে; আধুনিকতার দিকে এগোচ্ছে প্রতিদিনই। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝে নারীর চলাচলের মৌলিক নিরাপত্তা এখনো সন্তোষজনকভাবে নিশ্চিত হয়নি । মেট্রোরেল চালুর সময় অনেকে ভেবেছিলেন, অন্তত এই অত্যাধুনিক পরিবহন নারীদের যাত্রায় এক নতুন নিরাপদ বাহন হবে।
বিশেষ করে কর্মজীবী নারীরা ধারণা করেছিলেন, বাসের ভিড়, খারাপ আচরণ এবং প্রতিদিনের হয়রানির মতো সমস্যাগুলো থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মিলবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, মেট্রোরেল দ্রুত ও কার্যকর হলেও নারীর নিরাপত্তা-সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
প্ল্যাটফর্মে অযথা ভিড়, ট্রেনে ওঠানামার সময় ধাক্কাধাক্কি, নারীদের জন্য নির্ধারিত কোচে পুরুষদের প্রবেশ- এসব অভিযোগ নিয়মিতভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসে।
অর্থাৎ পরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিকতা যুক্ত হলেও পুরানো সমস্যাগুলোর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। শুধু মেট্রোরেল না, এপস ছাড়া রাইড শেয়ারও বেড়েছে সমপ্রতি। বিপত্তি বাধছে এখানেই।
ঢাকার ভয়াবহ গণপরিবহন সংকটের মধ্যে ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপের মাধ্যমে ট্যাক্সি সেবাদানকারী কোম্পানি উবার যাত্রা শুরু করলে স্বস্তি পেয়েছিল নারী যাত্রীরা। উবার চালু হওয়ার পর যখন বিআরটিএ নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ দেয়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় সরকার দ্রুত জানায় যে উবারসহ অন্যান্য রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ করা হবে না।
তবে জানানো হয় যে এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা, ২০১৭’ অনুমোদন করে।
একই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি নীতিমালাটি গেজেটে প্রকাশিত হয় এবং ৩ মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়। কিন্তু বাস্তবে নীতিমালার বেশিরভাগ শর্তই প্রয়োগ করা হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাইক ও গাড়ির চালকরা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিজেদের সুবিধামতো যাত্রী তুলতে ও নামাতে শুরু করেন, ফলে সেবা খাত আবারো এলোমেলো হয়ে পড়ে। এমনকি অনেক চালক অ্যাপে না গিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী সংগ্রহ করে নিজেদের পছন্দমতো ভাড়ায় পরিবহন শুরু করে। আর তাতেই নারীদের হেনস্তা শুরু হয়।
এ বছরের ২৮ মে এক নারী ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে শ্যামলী যেতে মিরপুর ১২ নম্বর থেকে রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেলে ওঠেন। কিন্তু তাকে সেখানে না নিয়ে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালের ভাগদী এলিট স্টিল মিলের সামনের সড়কের ব্রিজের পাশের নির্জন স্থানে নিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন বাইক রাইড শেয়ার চালক। এ সময় নারীর সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে বিকাশের মাধ্যমে তার স্বজনদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।
বাস, ট্রেন, লঞ্চ- কোনো পরিবহনই নারীর পুরোপুরি নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভিযুক্তরা ‘সুযোগ পেলে’ নয়, বরং নিজেরাই ‘সুযোগ তৈরি করে’ অপরাধ সংঘটিত করে।
প্রতিনিয়ত এসব হেনস্তা থেকে রক্ষা পেতে নারীদের করতে নীরব যুদ্ধ। ঢাকার গণপরিবহনের মূল ভরসা এখনো বাস। কিন্তু নারীদের জন্য এই পরিবহনই সবচেয়ে বেশি হয়রানির উৎস। বাসে প্রতিদিন নারীরা যে ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হন, তা যেন এক অব্যক্ত যন্ত্রণা হয়ে বছরের পর বছর চলছে। অতিরিক্ত ভিড়ের সুযোগ নিয়ে গায়ে হাত দেয়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধাক্কা, বাজে মন্তব্য- এসব ঘটনা নারী যাত্রীদের জন্য নিত্যদিনের বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে চালক ও হেলপারদের আচরণও অশালীন হয়, ফলে যাত্রাপথ নারীরা পড়েন অসহায় ও অনিরাপদ।
ঢাকার সড়ক ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোও নারীদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে। রুট ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা, পর্যাপ্ত স্টপেজের অভাব, অতিরিক্ত গাড়ির চাপ, ফুটপাত দখল, অপ্রতুল আলো- সব মিলিয়ে নারী যাত্রীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে চলাচল করেন। কোনো নগরের উন্নয়ন যদি নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত না করতে পারে, তবে সেই উন্নয়নকে মানবিক বা টেকসই বলা যায় না।
কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে নারীদের বড় ভরসা গণপরিবহন। কিন্তু প্রতিদিনের এই যাত্রা তাদের জন্য এক নীরব সংগ্রাম। গন্তব্যে পৌঁছানোর পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও যেন এক যুদ্ধ। নির্ধারিত আসনের নিয়ম অমান্য করা থেকে শুরু করে মৌখিক, শারীরিক ও মানসিক হয়রানি সব মিলিয়ে নারীদের যাত্রাপথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সড়ক পরিবহন আইনসহ বিভিন্ন আইনে নারীর সুরক্ষার বিধান থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা সীমিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন কঠোর হলেও প্রয়োগ দুর্বল হলে তা কার্যত কাগুজে ঘোষণায় পরিণত হয়। গণপরিবহনে হয়রানি রোধে মাঝে মাঝে অভিযান, সিসিটিভি নজরদারি বা বিশেষ ট্রাফিক উদ্যোগ দেখা গেলেই গণপরিবহনে নারী হেনস্তা কমে আসবে। পাশাপাশি হেনস্তার প্রতিবাদ ও এর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে নারী নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
