মেগা প্রকল্পের ঋণে সরকারের চ্যালেঞ্জ

মার্চ ০১ ২০২৬, ১৯:১০

বিদেশি ঋণনির্ভর বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে প্রশ্ন। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি, পরিচালনাগত জটিলতা এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক ঋণের চাপ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনার এই সমীকরণ এখন নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারের বৈদেশিক ঋণ ছিল ২০ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে ঋণের পরিমাণ পৌঁছায় ৮০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ে ঋণ প্রায় চার গুণ হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই ঋণের বিপরীতে অর্থনীতিতে কতটা প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।

বিমানবন্দরের টার্মিনাল, ব্যয় বাড়ল, সুফল ঝুলে রইল

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা সংশোধন করে ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি ৬ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এসেছে দ্বিপক্ষীয় ঋণ থেকে।

২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আংশিক উদ্বোধনও করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে পূর্ণাঙ্গ চালুর লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ভূমিসেবা ও পরিচালনাগত জটিলতা প্রকল্পটিকে আটকে দেয়। এর মধ্যে ঋণের সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়েছে। মূল ঋণের অবকাশকালও কমেছে।

বিশ্বব্যাংক-এর ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের ভাষায়, বিদেশি ঋণের সুদ অর্থ ছাড়ের দিন থেকেই গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ প্রকল্প চালু হোক বা না হোক, সুদের ঘড়ি থেমে থাকে না।

ঋণ পরিশোধের চাপে নতুন সমীকরণ

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পূর্বাভাস দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ০৮৬ বিলিয়ন ডলার। পরিশোধের এই ঊর্ধ্বগতি বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-এর মহাপরিচালক এ কে এম এমামুল হক বলেন, চলমান প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ দায় অনেক সময় পূর্বাভাসে প্রতিফলিত হয় না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ঋণমান হ্রাসের বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণঝুঁকিতে মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে, তবে বড় ধাক্কা সামাল দেয়ার সক্ষমতা সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই সতর্কবার্তা ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা ও অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্র, সক্ষমতা আছে, উৎপাদন কম

২০১৪ সালে শুরু হওয়া মাতারবাড়ী ২ গুণ ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫৬ হাজার ৬৯৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৭ হাজার ৯৪৫ কোটি ৩ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চালু হলেও বয়লারের প্রযুক্তিগত সমস্যায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিম বলেছেন, প্রত্যাশিত উৎপাদন না হওয়ায় সরকার ক্ষতির মুখে পড়ছে। সক্ষমতা ভাড়া বাবদ বছরে প্রায় ১ হাজার ১৬৯ কোটি টাকাব্যবস্থাপনায় বিশেষ যত্ন নেয়া হয়। বীজ থেকে ফলন পর্যন্ত সময় লাগে মেয়াদ অনুযায়ী কয়েক মাস। আইটি কৃষি ও স্থানীয় কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেয়া হয়, যাতে ফসলের গুণমান ও উৎপাদন বাড়ে।

ফুলতলী তরমুজগুলো গেল মৌসুমে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়েছে। ফলে স্থানীয় কৃষকরা শুধু গ্রামের বাজারেই নয়, বড় শহরগুলোর বাজারেও সরবরাহ করে জমিয়ে ফেলেছেন ভাল মানের নিরাপদ ফল।

কৃষকদের অভিজ্ঞতা : গ্রামের কৃষক ফোরকানের মতো আরও অনেকে আছেন, যারা তরমুজ চাষকে সফল কৃষি উদ্যোগ হিসেবে স্থাপন করেছেন। তরমুজ চাষতে লাগানো খরচ, পানি ও সার খরচ বিবেচনায় লাভের পরিমাণ অন্যান্য ফসলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।

চাষিরা জানান, এর আগে ধান বা অন্যান্য মৌসুমি ফসল থেকে লাভ কম পেতেন। কিন্তু তরমুজ চাষে আয়ের সুযোগ বেশি হওয়ায় নতুন নতুন মানুষও এতে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষত ধাপে ধাপে তরমুজের বাজার চাহিদার কারণে পারিবারিক আয়ের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

অর্থনৈতিক মূল্যায়ন : চালের মতো প্রধান ফসলের পাশাপাশি তরমুজ একটি উচ্চ-মানের পধংয পৎড়ঢ় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, তরমুজের মূল্যায়ন সাধারণত মৌসুমের চাহিদা, স্বাদ ও পুষ্টিগুণের ওপর নির্ভর করে। এই ফলটি গ্রীষ্মকালে খুব জনপ্রিয়, ফলে বাজারে চাহিদা থাকে বেশি এবং দামও তুলনামূলক ভালো থাকে।

একদিকে জাতীয় পরিসরে তরমুজের বাজারে সিন্ডিকেটের দাপটের খবর থাকলেও, গ্রাম পর্যায়ে উৎপাদন বাড়াতে এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনা সহজ করতে বিভিন্ন দলিলভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়াও সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

চাষ পদ্ধতি ও প্রযুক্তি : তরমুজ চাষে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিকল্পিত চাষ পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ছে। মাটি প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সার প্রয়োগ, পানি নিয়ন্ত্রণ, পোকামাকড় প্রতিরোধ ও রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয় কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠাণ্ডা-গরম উভয় আবহাওয়াতেই তরমুজ ভালো ফলন দেয় যদি মাটি ও সার ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে করা হয়। তাই সঠিক সময় বীজ বপন, ব্যালান্সড সার প্রয়োগ এবং পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ মেলালে ফলন বেড়ে যায়।

বাজার ও ব্যবসায়িক চ্যানেল : স্থানীয় পাইকারি হাট, চট্টগ্রাম শহরের ফলবাজার, বড় শহরে পাইকারি সরবরাহ, ঢাকার গ্রীষ্মকালীন বাজার- যেসব স্থানে ক্রেতারা তরমুজ কিনে তাদের এলাকায় বিক্রি করেন, ওজন অনুযায়ী দাম ঠিক করেন এবং ফুটপাত/বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করেন। ফলে সরাসরি ক্ষেত থেকে বাজারে সরবরাহের কারণে চাষিরা লাভের অংশ বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : তরমুজ চাষ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত বছর থেকে বাড়ছে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। মতো তুলনামূলক কোল্ড স্টোরেজ, পরামর্শ, বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা দিলে তরমুজকে একটি শক্তিশালী পধংয পৎড়ঢ় হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে কৃষি বিশ্লেষকরা মনে করেন।

এছাড়া বিদেশি ফলের মতো বিদেশি জাতের তরমুজ আবাদ করার সম্ভাবনাও চাহিদাকেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছিল, যাতে দেশি বাজারে আমদানি কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো যায়।

ফুলতলী গ্রাম কৃষিকাজে একটি সফলতার জন্ম দিয়েছে যেখানে তরমুজ চাষে মিলেছে কোটি টাকার বাজার। ক্ষেত থেকে পাইকারি বাজার পর্যন্ত সরাসরি যোগাযোগ ও উন্নত চাষ পদ্ধতির কারণে লাভের পরিমাণ বেড়েছে। এটি শুধু গ্রামের অর্থনীতিকেই পরিবর্তন করছে না সে সাথে স্থানীয় ও জাতীয় বাজারেও তরমুজকে জনপ্রিয় একটি পধংয পৎড়ঢ় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  

এক্সক্লুসিভ আরও