জোটেই অস্থিরতা চরমে
সক্রিয় দুটি জোটের সংসারে তুষের আগুন
জানুয়ারি ১৫ ২০২৬, ০২:৩০
- বহিষ্কারেও থামেনি বিএনপির শরিক দলের আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী, চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাতে বেশ কিছু প্রত্যাহারে মিলছে কিছুটা স্বস্তি
- জামায়াত জোটে অস্থিরতা চরমে- ইসলামী আন্দোলনে আসনের মর্যাদার লড়াই, ‘উন্মুক্ত’ প্রার্থিতার সম্ভাবনা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে
অন্যদিকে আরেকটি নির্বাচনী জোটে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির জোট মূলত অতীতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত থাকা গণঅধিকার পরিষদ, গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত বিভিন্ন দলসহ আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এলডিপিসহ মোট এগারো দলের একটি জোট গঠন করেছে, যারা পৃথকভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি ও আসন সমন্বয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এই দুটি জোটকে কেন্দ্র করেই বর্তমানে নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক তৎপরতা ও হিসাব-নিকাশ জোরালো হয়ে উঠেছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয়া একাধিক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর আবির্ভাবে বিব্রত অবস্থায় পড়েছে বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়া এসব নেতাকে বহিষ্কার করেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে বহিষ্কারের পরও মাঠে সক্রিয় থেকেছেন বিদ্রোহীরা, যার ফলে ভোটের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি ডেকে কথা বলার পর কিছু বিদ্রোহী প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় বিএনপিতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও শরিকদের একাধিক ‘ভাইটাল’ বা গুরুত্বপূর্ণ আসনে এখনো বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন। এসব আসনে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিএনপির কৌশল নির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ এগারো দল এখনো আসন সমঝোতা করে আসন বণ্টন চূড়ান্ত করতে পারেনি। দীর্ঘ আলোচনার পরও কোন আসনে কোন দলের কে প্রার্থী হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় জোটবদ্ধ দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
আসন সমঝোতা নিয়ে জোটের একাধিক শরিক দল নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও প্রাপ্তির প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, যা সমঝোতার পথকে আরও জটিল করে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে জোটে ভাঙনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এদিকে বিভিন্ন আসনে বিএনপি তার জোটসঙ্গীদের জন্য প্রার্থী ছাড় দিয়েছে।
এর মধ্যে বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, সিলেট-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এবং নীলফামারী-১ আসনে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীকে সমর্থন দিয়েছে দলটি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী, যশোর-৫ আসনে অনিবন্ধিত জমিয়তের রশিদ বিন ওয়াক্কাস, নড়াইল-২ আসনে অনিবন্ধিত এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খানকে আসন ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির রেদোয়ান আহমদ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে আমজনতার দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়ার জন্যও বিএনপি প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২ আসনের পাশাপাশি ঢাকা-১৮ আসনেও মনোনয়নপত্র জমা দেন। তবে নির্বাচন কমিশনে আপিলের মাধ্যমে তিনি বগুড়া-২ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পান।
জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা রেদোয়ান আহমদ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, সৈয়দ এহসানুল হুদা, রেজা কিবরিয়া ও ববি হাজ্জাজ ইতোমধ্যে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জোটের অন্যরা নিজ দলের প্রতিকে লড়বেন।
তবে এসব সমঝোতার পরও ঢাকা-১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, পটুয়াখালী-৩, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২ ও যশোর-৫সহ শতাধিক আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখনো নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন, যা জোটের ভেতরে বাড়তি চাপ ও অস্বস্তির সৃষ্টি করছে। ইতোমধ্যে তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাত করে অনেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। বিএনপি মনে করছে বাকিরাও প্রত্যাহার করে নেবেন।
তবে বেশ কিছু আসনে এখনো বিদ্রোহীরা জড়ালো প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে জাম্যাত, ইসলামী আন্দলন, এনসিপিসহ ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের ভেতরে আসন সমঝোতা নিয়ে তীব্র অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন এই জোটে শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে জামায়াতের টানাপোড়েনে পুরোসমঝোতা প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্ব শুধু আসনের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জোটের ভেতরে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব প্রতিষ্ঠার একটি কঠিন প্রতিযোগিতাও এতে জড়িয়ে আছে। ১১ দলীয় জোটের মধ্যে আটটি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ঘিরে জটিলতা রয়ে গেছে। আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে কঠিন অবস্থান নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গেও জামায়াতের টানাপোড়েন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। যেসব আসনে জামায়াত ছাড় দিতে রাজি নয়, সেখানে তারা উন্মুক্ত প্রার্থী দেওয়ার বিকল্প ভাবনাও করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোট রাজনীতিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এবারের নির্বাচনে সেই চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সময়মতো আসন বণ্টন ও বিদ্রোহ দমন করতে না পারলে এর প্রভাব সরাসরি নির্বাচনী ফলাফলে পড়তে পারে। সামনে দিনগুলোতে দলগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই অস্থিরতা সামাল দিতে পারে, সেদিকেই এখন সবার নজর।









































