খাদ্যে অনিশ্চয়তার প্রবল ঝুঁকিতে দেশ

নভেম্বর ০১ ২০২২, ০৯:৪১

ডেস্ক প্রতিবেদক: জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করে ২০২৩ সালের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ের দিকে দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে। শস্য রপ্তানির চুক্তি থেকে রাশিয়া হঠাৎ সরে আসায় পূর্বাভাসের আগেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে খাদ্য ঘাটতির নতুন আওয়াজ উঠেছে।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, শস্য রপ্তানির চুক্তি থেকে রাশিয়া হঠাৎ বেঁকে বসায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের খাদ্যবাহী ১৭৬টি জাহাজ এখন নিজ নিজ দেশের সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। বর্তমানে এসব জাহাজে ২০ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য কৃষ্ণসাগরে আটকা পড়েছে।

এতে করে বাংলাদেশসহ আলজেরিয়া, মিশর, ইয়েমেন ও ভিয়েতনামের মতো অনেক দেশের কমপক্ষে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষের খাদ্য পাওয়ার সুযোগ কমে গেছে। এর ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়েও এসব অঞ্চলের দেশগুলোর খাদপণ্যের বাজার নতুন করে অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ নিয়ে খোদ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এ পরিস্থিতিতে খাদ্যপ্রাপ্তিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশ।

এদিকে, ঋণপত্র খুলেও পণ্য আনতে না পারায় বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরাও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারা জানান, জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কৃষ্ণসাগরের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার পর এরই মধ্যে ইউক্রেন থেকে কয়েক লাখ টন গম আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে। ধাপে ধাপে এসব গম চট্টগ্রাম  সমুদ্রবন্দরে পৌঁছার কথা। শুধু গম নয়, অন্যান্য দেশ থেকে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডালসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য এই আমদানির তালিকায় রয়েছে, যা এখন মহাসমুদ্রের মধ্যে গন্তব্যের অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত সরকারও। বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রোববার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে বাণিজ্য, অর্থ, খাদ্য, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র, নৌ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, এনবিআর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ও বিভাগীয় প্রধানদের জরুরি তলব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দেশের সার্বিক খাদ্য পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদনের বর্তমান ও আগামী ফলনের সম্ভাব্য চিত্র, চাহিদা অনুযায়ী পণ্যভিত্তিক মজুত, সার ও জ্বালানি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি, ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ, এলসি খোলার পরিস্থিতি, বন্দর থেকে খালাসের পরিমাণ এবং পণ্যভিত্তিক দাম ও বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে যার যার অবস্থান থেকে সচিব ও বিভাগীয় প্রধানরা তার মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সবশেষ পরিস্থিতি ও সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরেন।

এ সময় মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা জানিয়ে বলেন, যে কোনো মূল্যে দেশে খাদ্য সরবরাহ ও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে হবে। একই সঙ্গে দামও যাতে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং করতে হবে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ কালবেলাকে বলেন, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে থাকা ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত এবং দাম স্বাভাবিক রয়েছে। চিনির দাম কিছুটা ঊর্ধ্বগতি থাকলেও পর্যাপ্ত চিনি আমদানির উদ্যোগ রয়েছে। যার অনেকাংশ এরই মধ্যে বন্দরে আসা শুরু করেছে। বাকিগুলো পাইলাইনে রয়েছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে নিষেধাজ্ঞা-পাল্টা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুরু হয়েছে। যার প্রথম ধাক্কা পড়েছে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনেও। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বে মোট গম উৎপাদনের ৩০ শতাংশ হয় ইউক্রেন ও রাশিয়ায়। আর ভুট্টার ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় এই দুই দেশে। যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে এই দুই দেশ থেকে গম ও ভুট্টাসহ অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বন্ধ হয়ে গোটা বিশ্বকে খাদ্যসংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভোজ্যতেল রপ্তানিতেও শীর্ষে এ দুই দেশ।

সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে উচ্চমূল্যের কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি হবে। এই সংঘাত কমপক্ষে ১ কোটি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে, যা তৈরি করতে পারে ভয়াবহ রকম দুর্ভিক্ষ। সহসাই যুদ্ধ বন্ধ না হলে সেই দুর্ভিক্ষ চলতে পারে কয়েক বছর।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি উন্নতি দিকে গেলেও করোনা মহামারির প্রভাবে আবারও তার অবনতি হয়েছে। খোদ অর্থমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যেই দাবি করা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার হচ্ছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। আর অতিদারিদ্র্য সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বেশিরভাগ খাদ্যপণ্যের উৎপাদনেই রয়েছে বিরাট ঘাটতি। ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন। এর বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন হচ্ছে মাত্র আড়াই লাখ টন। চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানি হচ্ছে। চিনির চাহিদা আছে ১ লাখ টন, সেখানে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টন। অর্থাৎ চিনির চাহিদারও প্রায় ৯৯ শতাংশ আমদানিনির্ভর। মসুর ডালে ৫ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ঘাটতি সাড়ে ৩ লাখ টন। পেঁয়াজের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি। তবে ৩৫ লাখ টনের বেশি উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ জটিলতায় পচে যায় তার ২৫ শতাংশ। ফলে প্রতিবছর থেকে ৯ লাখ টন আমদানিও করতে হয়। আটা-ময়দার চাহিদা পূরণে প্রতিবছর চাহিদাকৃত গমের ৫ শতাংশ আসছে বিদেশ থেকে।

ধানের উৎপাদন ভালো হলেও স্বস্তি নেই অভ্যন্তরীণ বাজারে। তা ছাড়া বন্যা, খরা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উৎপাদন কমার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে প্রতিবছরই। ফলে উৎপাদন হলেও আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। আবার আন্তর্জাতিক বাজার সব সময় অস্থিতিশীল। বিদেশে দাম বাড়লে দেশে বাড়ে তার চেয়েও বেশি। এ কারণে চাহিদা পূরণে প্রতিবছর খাদ্যশস্য আমদানিতে গড়ে ০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়ে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু জানতে চাইলে কৃষি সচিব মো সায়েদুল ইসলাম কালবেলাকে জানান, ‘খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমরা ধান, গম ও ভুট্টা ছাড়াও সব ধরনের দানাদার ফসল শাকসবজি ও ফলমূলসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যেরও উৎপাদন বাড়াতে জোর দিয়েছি। সব ফসলেই আমরা প্রতি বছর প্রবৃদ্ধির ধারাতে রয়েছি। এ ছাড়া আগামী ৩ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনার আওতায় সরকার ধানে ৩২ লাখ টন, তেলবীজ উৎপাদনে ৪০-৫০ শতাংশ বৃদ্ধি, পেয়াজে আগামী বছরেই স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা চলছে। এর জন্য সব রকম উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড বিজ মাঠে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে।

‘একফসলি জমিকে দুই ফসলে এভাবে ততোধিক ফসল উৎপাদন শুরু হয়েছে। ফলে করোনার মধ্যেও আমাদের খাদ্যের উৎপাদন সুরক্ষিত অব্যাহত ছিল। সার, বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ, কীটনাশক, মাড়াই যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। সেটি আগের চেয়ে আরও বাড়বে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সহায়তা দেব। এসব পদক্ষেপে খাদ্য উৎপাদনও বাড়বে এবং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে। ফলে যে সম্ভাব্য বিপর্য়েয়ের কথা বলা হচ্ছে ওই সময় আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো।’

খাদ্য সচিব মো. ইসমাইল হোসেন এনডিসি জানান, সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ বা মন্দা মোকাবিলায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়ানোর ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। এর লক্ষ্যে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের খাদ্য স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আগাম আমদানিও অব্যাহত রাখা হবে। ওএমএসসহ খাদ্যবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি আরও জোরদার এবং আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক মো. আসাদুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, বৈশ্বিক বিপর্যয়ে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে খাদ্য নিরাপপত্তায়। সেখানে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে সব পণ্য চাইলেও চাহিদামতো উৎপাদন করা যাবে না। তাই আমদানিও করতে হবে। কিন্তু সেখানেও সক্ষমতা থাকা লাগবে। যাতে খাদ্য আমদানিতে ডলার সংকটে পড়তে না হয়। তা ছাড়া সবার জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নারীদের সমপরিমাণ দিলেই হবে না, তা হতে হবে নিরাপদ খাদ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  

এক্সক্লুসিভ আরও